একটি ফাউল, যার পর থেকে ইনজুরি পিছু ছাড়েনি নেইমারের
ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের প্রতিভা নিয়ে কখনো কারো প্রশ্ন ওঠেনি; প্রশ্ন উঠেছে শুধু তাদের ভাগ্য নিয়ে। ব্রাজিলিয়ান মহাতারকা নেইমার জুনিয়র হয়তো সেই তালিকার একেবারে ওপরের দিকের একটি নাম। বল পায়ে তার জাদু, ক্ষিপ্র গতি, ড্রিবলিং আর অবিশ্বাস্য সৃজনশীলতা একসময় ফুটবল বিশ্বকে বিশ্বাস করিয়েছিল—লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো পরে ফুটবলের নতুন রাজা হবেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ আটকে দেয় তার ভাগ্য, একের পর এক ভয়াবহ ইনজুরি শেষ করে দেয় তার আকাশ ছোয়ার স্বপ্ন।
ফুটবলপ্রেমীদের মনে আজও একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—২০১৪ বিশ্বকাপের সেই নির্মম ফাউলই কি নেইমারের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল?
২০১৪ সালের ৪ জুলাই, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ ছিল কলম্বিয়া। স্বাগতিক ব্রাজিল তখন শিরোপার স্বপ্নে বিভোর, আর সেই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন নেইমার।
ম্যাচের শেষ দিকে হঠাৎ পেছন থেকে হাঁটু দিয়ে আঘাত করেন কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার হুয়ান কামিলো জুনিগা। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন নেইমার। পুরো স্টেডিয়াম এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সেই আঘাতে তার কোমরের তৃতীয় কশেরুকা (L3) ভেঙে যায় এবং তার ২০১৪ বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায় সেখানেই। এই ঘটনা ব্রাজিল দলকে এমনভাবে ভেঙে দিয়েছিল যে পরের ম্যাচে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে পরাজয় বরণ করে সেমিফাইনাল থেকেই বিদায় নিতে হয় ব্রাজিলকে।
অনেকে মনে করেন, সেদিনই যেন বদলে যায় নেইমারের ভাগ্য। যদিও চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ওই ইনজুরি পরবর্তী সকল ইনজুরির সরাসরি কারণ নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এরপর যেন ইনজুরিই হয়ে ওঠে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। এরপর থেকে ইনজুরি মুক্ত ভাবে একটা মৌসুম নেইমার পার করতে পারেনি। পায়ের মেটাটারসাল ভাঙা, গোড়ালির লিগামেন্টের চোট, হ্যামস্ট্রিংয়ের সমস্যা, অ্যাডাক্টর ইনজুরি—একটির পর একটি ধাক্কায় বারবার মাঠ ছাড়তে হয়েছে তাকে। ২০২৩ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে হাঁটুর এসিএল ও মেনিস্কাস ছিঁড়ে যাওয়ার পর আবারও দীর্ঘ পুনর্বাসনে যেতে হয় ব্রাজিলের এই তারকাকে।
অনেকের মতে, প্রতিপক্ষের ফাউলের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠা এবং নেইমারের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত তার ক্যারিয়ারে বড় প্রভাব ফেলেছে। তার ড্রিবলিং ছিল এতটাই ভয়ংকর যে, অনেক ডিফেন্ডার বল থামানোর বদলে মানুষটাকেই থামানোর পথ বেছে নিতো। প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই কঠিন ট্যাকলের শিকার হয়েছেন তিনি।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে সান্তোসের জার্সিতে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই, ২০১১ সালে সান্তোসকে কোপা লিবার্তাদোরেস জিতিয়ে পুরো বিশ্বের নজর কাড়েন।
এরপর ২০১৩ সালে যোগ দেন বার্সেলোনায়। তার উপস্থিতিতে লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেজকে নিয়ে গড়ে ওঠে ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগ—'এমএসএন'। ২০১৪-১৫ মৌসুমে বার্সেলোনা জেতে লা লিগা, কোপা দেল রে ও উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। ট্রেবলজয়ী সেই দলের অন্যতম সেরা নায়ক ছিলেন নেইমার।
২০১৭ সালে বার্সেলোনা ছেড়ে ২২২ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফিতে প্যারিস সেইন্ট-জার্মেইন (পিএসজি) তে যোগ দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার হয়ে যান তিনি। এত বছর পরও সেই রেকর্ড অটুট। যদিও নেইমার মেসির ছায়া থেকে বেড়িয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞর মতে নেইমারের বার্সেলোনা ছাড়ার সিদ্ধান্ত ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি।
নেইমার জাতীয় দলের জার্সিতেও লিখেছেন সোনালি অধ্যায়। ব্রাজিলের হয়ে শতাধিক ম্যাচ খেলে কিংবদন্তি পেলের গোলসংখ্যা ছাড়িয়ে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসন নিজের করে নিয়েছেন নেইমার। কনফেডারেশনস কাপ জিতেছেন, অলিম্পিকে এনে দিয়েছেন প্রথম ফুটবল স্বর্ণপদক।
তবুও তার ক্যারিয়ারের পাতায় একটি শূন্যতা রয়ে গেছে—বিশ্বকাপ। ২০১৪ সালে ইনজুরি তাকে কাঁদিয়েছে। ২০১৮ সালে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হৃদয়ভাঙা বিদায়। আর ২০২৬ বিশ্বকাপের স্বপ্নও বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলেছে ইনজুরি। শেষমেশ ২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অফ ১৬ তে নরওয়ের সাথে ২-১ গোলে হার নিয়ে অবসরের ঘোষণা দেন এই মহা তারকা।
ফুটবল বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের বিশ্বাস, যদি বারবার চোটে না পড়তেন, তাহলে নেইমারের নামে হয়তো একাধিক ব্যালন ডি'অর লেখা থাকত। কারণ প্রতিভা, দক্ষতা এবং ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার সামর্থ্য—সবকিছুই ছিল তার মধ্যে।
নেইমারের ক্যারিয়ার তাই শুধু গোল, ট্রফি কিংবা রেকর্ডের গল্প নয়। এটি এমন এক প্রতিভার গল্প, যিনি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন, কিন্তু বারবার হার মেনেছেন নিজের শরীরের কাছে।
হয়তো একদিন ফুটবল ইতিহাসে নেইমারকে মনে রাখা হবে শুধু ব্রাজিলের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নয়, বরং এমন এক শিল্পী হিসেবে—যার তুলিতে আঁকা ফুটবল ছিল অসাধারণ, কিন্তু যার ক্যানভাস বারবার ছিঁড়ে দিয়েছে ইনজুরি।