জুলাই বিপ্লবের রক্তঝরা দিনগুলো: কোটা আন্দোলন থেকে 'এক দফা' ও 'মার্চ টু ঢাকা'র ঐতিহাসিক ঘটনাচক্র
বিশেষ প্রতিবেদন:
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান হুট করে ঘটা কোনো ঘটনা ছিল না। এটি ছিল মানুষের মধ্যে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে জমে ওঠা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। একের পর এক রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, অনিয়ম, গুম, খুনের এক বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল সাধারণ কোটা বিরোধী আন্দোলন হিসাবে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের নির্যাতন ও অহমিকা তাকে পরিনত করেছিল এক দফার সরকার পতনের আন্দোলনে। বিশেষ করে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ—এই কয়েক দিনের সরকারের তীব্র নির্যাতন, জনমনে ক্ষোভ, উত্তেজনা ও ঘটনাপ্রবাহ তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসনের পতন ত্বরান্বিত করেছিল।
ঘটনাচক্র ১: কোটা আন্দোলন থেকে জীবন দেওয়া
জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে দ্বিতীয় দফায় কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। তবে পরিস্থিতি মোড় নেয় ১৫ জুলাই থেকে, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হন, দেশব্যাপী সংঘর্ষে ছয়জন প্রাণ হারান এবং আবু সাঈদের হত্যা দেশব্যাপী এতটাই নাড়া দিয়েছিল যে কোটা আন্দোলন তীব্র গণ আন্দোলনে রূপ নেয়।
১৮ ও ১৯ জুলাই আন্দোলন দমন করতে তৎকালীন সরকার ইন্টারনেট পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, দেশজুড়ে জারি করা হয় কারফিউ এবং সেনা মোতায়েন করা হয়।
ঘটনাচক্র ২: ৯ দফা দাবি ও গুম-নির্যাতনের অভিজ্ঞতা
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও কারফিউর মধ্যেই ১৮ জুলাই রাতে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে তুলে নিয়ে চোখ বেঁধে নির্যাতন করা হয়। পরবর্তীতে ১৯ জুলাই আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারসহ একাধিক সমন্বয়ককে গুম ও নির্যাতন করা হয়। তখন একদিকে সমন্বয়কদের করা হচ্ছিল গুম, গ্রেপ্তার, নির্যাতন; অন্যদিকে চলছিল আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। এমন সংকটময় এক মুহূর্তে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের জাতির সামনে ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ৯ দফা।
পরবর্তীতে ২৭ জুলাই ডিবি কার্যালয়ে অস্ত্রের মুখে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কদের জিম্মি করে আন্দোলন প্রত্যাহারের ভিডিও ধারণ করা হয়। কিন্তু রাজপথে থাকা শিক্ষার্থীরা এই জোরপূর্বক ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ৯ দফা দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।
ঘটনাচক্র ৩: ৩ আগস্ট — শহীদ মিনারের জনসমুদ্র ও 'এক দফা'র ঘোষণা
ডিবি হেফাজত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সমন্বয়করা পুনরায় একত্রিত হন জুলাই গণহত্যার বিচার এবং ৯ দফা নিয়ে। ৩ আগস্ট ছাত্র আআন্দোলনের পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল থেকে দলে দলে মিছিল আসতে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতারা সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় ছাত্র জনতার রক্তে রঞ্জিত আওয়ামী লীগের আর ক্ষিমতায় থাকার অধিকার নেই এবং ঐদিন সকালে হাসিনার দেওয়া আলোচনা প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করে ছাত্র নেতারা বলে।
ঐদিন বিকেলে ১টার পর থেকেই পুরো ঢাকা শহর শহীদ মিনারে গিয়ে মিশে যায়। লাখ লাখ ছাত্র-জনতার জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে নাহিদ ইসলাম ঐতিহাসিক ঘোষণাটি দেন:
"শেখ হাসিনা এবং তাঁর মন্ত্রিসভার পদত্যাগ এবং এই ব্যবস্থার বিলোপসাধন—আমাদের একমাত্র দাবি।"
ঐতিহাসিক ৩ আগস্টের এই একক দাবির মধ্য দিয়ে পুরো দেশের মানুষ দীর্ঘদিনের ভয় কাটিয়ে চূড়ান্ত রাজনৈতিক পরিবর্তনের লক্ষে একতাবদ্ধ হয়। শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন।
ঘটনাচক্র ৪: ৪ আগস্ট — সংঘাত ও 'মার্চ টু ঢাকা'র কৌশলগত সিদ্ধান্ত
৪ আগস্ট সারা দেশে সরকার সমর্থক গুন্ডা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। একদিনেই দেশজুড়ে শতাধিক আন্দোলনকারীর প্রাণহানি ঘটে। তৎকালীন সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে এবং মার্চ টু ঢাকা রুখে দিতে ৫ আগস্ট থেকে তিন দিনের জন্য পুনরায় অনির্দিষ্টকালের জন্য অল-আউট ইন্টারনেট শাটডাউন এবং কারফিউ ঘোষণা করে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আন্দোলনের নেতারা বুঝতে পারেন, ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আন্দোলন থমকে যেতে পারে এছাড়া সরকার ঢাকায় ঢোকার সকল পথ বন্ধ করে দিতে পারে তাই ৪ আগস্ট বিকেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া কৌশলগত কারণে জরুরি ঘোষণা দিয়ে কর্মসূচি এগিয়ে আনেন।
পূর্বে ঘোষিত ৬ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট ঢাকায় আসার চূড়ান্ত আহ্বান জানান তিনি। উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে সংঘটিত হওয়ার বা কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বাড়তি সময় না দেওয়া।
ঘটনাচক্র ৫: ৫ আগস্ট — ঐতিহাসিক লং মার্চ ও স্বৈরাচারের পতন
৫ আগস্ট সকাল থেকে সেনাটহল ও কারফিউ উপেক্ষা করে ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে লাখ লাখ মানুষ জড়ো হতে থাকেন। যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মিরপুর ও ধানমন্ডি এলাকা থেকে বিপুল জনস্রোত শাহবাগ ও গণভবনের দিকে এগোতে থাকে।
বেলা গড়ানোর সাথে সাথে পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। লাখো জনতার সামনে টিকতে না পেরে দুপুর আড়াইটার দিকে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে সামরিক হেলিকপ্টারে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। বিকেলে বিক্ষুব্ধ জনতা গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশ করে ঐতিহাসিক এই অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত বিজয়ের সূচনা করে।