৩৫ জুলাই, ‘মার্চ টু ঢাকা’ এক দিন এগিয়ে আনাই ছিল ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
বিশেষ প্রতিবেদন: ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট—গণঅভ্যুত্থানের ক্যালেন্ডারে যা স্মরণীয় হয়ে আছে ‘৩৫ জুলাই’ নামে। দিনটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক দফা দাবিতে দেশজুড়ে শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। রক্তক্ষয়ী এই দিনটিতে আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্ট ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৬ আগস্টের পরিবর্তে এক দিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট পালন করার ঘোষণা।
কৌশলগতভাবে এই সিদ্ধান্তটি ছিল আন্দোলনকারীদের সবচেয়ে বড় ‘ট্রাম্পকার্ড’, যা তৎকালীন সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকে মুহূর্তের মধ্যে পুরোপুরি দিশেহারা ও অপ্রস্তুত করে দেয়।
কেন এক দিন এগিয়ে আনা হয়েছিল ‘মার্চ টু ঢাকা’?
৩ আগস্টের সমাবেশ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মূলত ৬ আগস্ট 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল। কিন্তু ৪ আগস্ট সারাদেশে ছাত্র-জনতার ওপর চরম নৃশংসতা ও সহিংসতা নেমে আসে। বিভিন্ন পয়েন্টে অস্ত্র হাতে মাঠে নামে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এবং দিনভর চলে সংঘর্ষ ও হত্যাযজ্ঞ। সেদিন ফার্মগেটে একাদশ শ্রেণির ছাত্র গোলাম নাফিজকে গুলি করে হত্যাসহ ঐদিন দেশজুড়ে কমপক্ষে ৯১ জন আন্দোলনকারীকে হত্যা করে সরকারি বাহিনী ও আওয়ামিলীগের ক্যাডার বাহিনী। অন্যদিকে ঐদিন আন্দোলনকারীদের অনুকূলে সেনাবাহিনীর অবস্থান নেয় এবং সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে অনেকেই খোলামেলা ভাবে ছাত্র-জনতার পক্ষে অবস্থান নেয়, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে,
৪ আগস্ট ২০২৪ (রবিবার) সন্ধ্যা ৬টায় সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে এবং তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে।
আন্দোলনকারীরা অনুভব করে যে, ৬ আগস্ট পর্যন্ত সময় দিলে সরকার রাজধানী ঢাকার সকল প্রবেশপথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করার সুযোগ পাবে। এই আশঙ্কায় ৪ আগস্ট রাতেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া একটি ভিডিও বার্তায় কর্মসূচিটি এক দিন এগিয়ে ৫ আগস্ট পালনের আকস্মিক ঘোষণা দেন।
এই মাস্টারস্ট্রোক সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য ছিল:
- সরকারের প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা ভেস্তে দেওয়া: সরকার বা তার পেটোয়া বাহিনীকে ঢাকার নিরাপত্তা জোরদার করার সময় না দেওয়া এবং ঢাকার বাইরে থেকে ক্যাডার এনে ঢাকাকে অবরুদ্ধ করার সময় না দেওয়া।
- রাজপথের গতি ধরে রাখা: ৪ আগস্ট দেশের মানুষ স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের পতনের জন্য যে অভূতপূর্ব উৎসাহ নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছে সেই স্পিরিট ধরে রাখা এবং সরকারের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা।
রাজপথের চিত্র
৪ আগস্ট রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে চলে নির্মম হত্যাযজ্ঞ। ঢাকার শাহবাগ, কারওয়ান বাজার, বাংলা মোটর, উত্তরা, আফতাবনগর এবং বিশেষ করে মিরপুর-১০ গোলচত্বর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। মিরপুর-১০ এ প্রায় পাঁচ ঘণ্টার দীর্ঘ ও তীব্র সংঘর্ষের পর আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা পিছু হটতে বাধ্য হয়। একই সময়ে আন্দোলনকারীদের অনুকূলে সেনাবাহিনীর অবস্থান এবং আন্দোলনরত সাধারণ জনতার সঙ্গে তাদের সংহতি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, যা বিজয়ের পূর্বাভাস হিসেবে কাজ করে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকেল থেকেই সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে সরকার এবং মোবাইল ফোর-জি ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকার চলমান গণআন্দোলনকে ‘জঙ্গি হামলা’ আখ্যা দিয়ে কঠোর দমনের নির্দেশ দেয় এবং রাজপথে নামার আহ্বান জানায় দলীয় ক্যাডার বাহিনীকে। এমনকি আন্দোলনকারীদের ওপর সরাসরি গুলি না করার অনুরোধ জানিয়ে হাইকোর্টে করা রিট আবেদনও আদালত খারিজ করে দেয়।
সর্বাত্মক রাজনৈতিক সংহতি ও অন্তর্বর্তীকালীন চাপ
আন্দোলনকারীদের এই এক দিন এগিয়ে আনার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই সংহতি প্রকাশ করে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,
"বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তথা আপামর জনসাধারণের উত্থাপিত এক দফা ঘোষণার সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্মতা ঘোষণা করছে।"
একই সঙ্গে তিনি দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থক এবং গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণকে আন্দোলনকারীদের পাশে থেকে অসহযোগ আন্দোলন সফল করার আহ্বান জানান এবং উল্লেখ করেন দেশ এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কারওয়ান বাজারের রাজপথে নেমে আসেন ক্ষুব্ধ গণমাধ্যমকর্মীরাও। অন্যদিকে দেশজুড়ে অব্যাহত প্রাণহানি ও সহিংসতার সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
পতনের পূর্বাভাস
৪ আগস্টের গভীর রাত থেকেই রাজপথের বার্তা স্পষ্ট হতে থাকে। সরকারের জারি করা সান্ধ্য আইন (কারফিউ) আর প্রাণঘাতী বুলেটের ভয় উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাতের আঁধারেই লাখ লাখ মানুষ নিজ নিজ দায়িত্বে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়।
যেখানে ৪ আগস্ট পর্যন্ত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার দেশত্যাগ করা বা সরকারের এমন হঠাৎ পতন সাধারণ মানুষের কল্পনাতীত ছিল, সেখানে ‘৩৫ জুলাই’ বা ৪ আগস্টের এই একক ও সাহসী সিদ্ধান্তই ইতিহাসকে বদলে দেয়। এই ঘোষণার জের ধরেই পরদিন ৫ আগস্ট সকালে ঢাকায় নেমে আসে লাখো জনতার বাঁধভাঙা জোয়ার, যা শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা এবং বাংলাদেশে এক যুগান্তকারী নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা ঘটায়।